You are here
Home > সম্পাদকীয় > অনিল বসুর ” উঁই পোকা” তত্ত্ব

অনিল বসুর ” উঁই পোকা” তত্ত্ব

অনিল বসুর ” উঁই পোকা” তত্ত্ব
আনন্দ চ্যাটার্জী
দলে যখন ছিলেন অনিল বসু তখন দাপট আর অকথা, কুকথার জন্যে তাঁর খ্যাতি কম ছিল না।দল তখন ক্ষমতায়। প্রকাশ্য সভাতে সে সময়ের বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চুলের মুঠি ধরে কালিঘাটে পৌঁছে দেওয়ার কথা বললেন আরামবাগের দোর্দন্ডপ্রতাপ সি পি আই( এম) সাংসদ অনিল বসু।সংবাদমাধ্যমে বেশ শোরগোল পড়ে গেল।নিন্দা এবং প্রশংসা দুইয়ের ই ঝড় বইতে শুরু করলো। ডাকাবুকো নেতা হিশেবে অনিলবাবুর খ্যাতি যতোটা ছিল ততোটা খ্যাতি কিন্তু সাংসদ হিশেবে ছিল না। সংসদে বক্তৃতা দিয়ে সকলের নজর কাড়ার থেকে রেকর্ড সংখ্যক ভোটে জিতেই তিনি সকলের নজর কেড়েছিলেন।
মমতাকে ঘিরে অনিল বসুর সেই বিতর্কিত মন্তব্যের পর এক সাংবাদিক সি পি আই ( এম) এর রাজ্য সম্পাদক মন্ডলীর তৎকালীন এক সদস্যের কাছে বিষয়টির অবতারণা করেন। সাংবাদিকটি তখন অনিলবাবুর বক্তৃতায় একটু বেশি রকমের ইতিবাচক ভাবে উত্তেজিত।শান্ত গলায় সেই সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য উত্তর দিয়েছিলেন; এমন হুজুগ তোলার কি সার্থকতা আছে যে হুজুগের টেম্পোকে ধরে রাখা যাবে না?
তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। সুভাষ চক্রবর্তী বঙ্গ সি পি আই( এম) দলে ভোট মেশিনারীতে যে ” নবজাগরণ” ঘটিয়েছিলেন, আরামবাগে সেই কৌশলের ই সার্থক রচয়িতা ছিলেন অনিল বসু।যেমন মেদিনীপুর জেলার একটি অংশে ছিলেন লক্ষণ শেঠ।এই ভোট মেশিনারির নবজাগরণের ভাশুল যে সি পি আই( এম) সহ গোটা বামফ্রন্টকে দিতে হচ্ছে আজ– একথা তাঁদের অতি বড়ো সমর্থক ও অস্বীকার করতে পারবেন না।
বামফ্রন্টের একাংশের নেতৃত্বের যে ঔদ্ধত্য, আত্মম্ভরিতা, অসৌজন্য, অহঙ্কার ঘিরে নানা প্রচার, অপপ্রচার আছে সুভাষ চক্রবর্তী নিজে নন, তাঁর শিষ্য- প্রশিষ্য তড়িৎ তোপদার, গৌতম দেব, রঞ্জিত কুন্ডু ইত্যাদিদের নাম সর্বজনবিদিত।তেমনি ই বহুল আলোচিত অনিল বসুর ও নাম।আজ শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিরোধী দল, বিরোধী মতকে বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা না দেওয়ার যে অভিযোগ ওঠে, সেদিন সেই অভিযোগ উঠতো সুভাষ চক্রবর্তী, তড়িৎ তোপদার, লক্ষণ শেঠ, অনিল বসুদের বিরুদ্ধে।সাধারণ মানুষদের ভিতরে এঁদের লোকজনদের কথাবার্তা, জীবনযাপন, ব্যবহার– সব কিছু ই হয়ে গিয়েছিল চরম বিরক্তির বিষয়।
অনিল বসু যে চুঁচুড়াতে তাঁর উপস্থিতিতে নিজের পত্নীকে দিয়ে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর প্রতি বিষোদগার করিয়েছিলেন- তা ছিল অনেকখানি ই তাঁর দলের হুগলী জেলার সম্পাদকের কুর্সি দখল করতে না পারার হতাশার বহিঃপ্রকাশ।বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হউয়ার পর ই দল ঘিরে সুভাষ চক্রবর্তীর বেশ কিছু হতাশার খবরে সেই সময়ের খবরের কাগজ ভর্তি থাকতো। সৈফুদ্দিন চৌধুরীদের সঙ্গে নয়া দলে সুভাষ যাবেন কিনা তা নিয়ে সেই সময়ে জল্পনা কল্পনার শেষ ছিল না।তেমন উত্তেজনার মুহুর্তেও কিন্তু সুভাষ একটি বার ও দলের সমালোচনায় প্রকাশ্যে বা সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন নি।
এখানেই লুকিয়ে আছে বহুবিতর্কিত সুভাষ চক্রবর্তীর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা।যদিও সাংবাদ মহলে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে । সেটি হলো এই যে, এই নীরবতার কৌশল অবলম্বনের বুদ্ধি সুভাষের স্বকীয় ছিল? নাকি তাঁর অতি কাছের কোনো সতীর্থের পরামর্শ ই তিনি পালন করেছিলেন? এক ই কথা প্রযোজ্য একদা সুভাষের ভাব শিষ্য আর এক বিতর্কিত সি পি আই( এম) নেতা নেপালদেব ভট্টাচার্য সম্পর্কে ও।শত্রু শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে তাঁকে চরম তৎপরতার সঙ্গে বহিস্কার করেছিল সি পি আই( এম) ।সেদিন নেপালদেব ও কিন্তু একটি শব্দ তাঁর দলের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেন নি। পরবর্তী সময়ে দলের জ্যোতিবাবুর রাশ আলগা হওয়ার পর নেপালদেব আবার ফিরে এসেছেন।যদিও নেতৃত্বের কতোখানি বিশ্বাসযোগ্যতা তিনি ফিরে পেয়েছেন – সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন।
এসব পথে অনিল বসু হাঁটেন নি।আবার নিজে মুখ ও খোলেন নি।লক্ষণ শেঠের মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের শিবিরে গিয়েও যোগ দেন নি।যদিও তাঁর একদা ঘনিষ্ঠরা এই সময়কালে তদ্বির করেছেন দল যদি তাঁকে ফিরে নেয়। প্রকাশ্যে এ নিয়ে কোনোদিন প্রতিক্রিয়া দেন নি অনিল।তাঁর পুরনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ও তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়া নিয়ে কোনো আগ্রহ চোখে পড়ে নি।
এই অবস্থায় প্রায় পাঁচ বছর পরে প্রকাশ্যে ” উঁইপোকা” তত্ত্বের অবতারণা করলেন অনিল বসু।এটা কি তাঁর আবার রাজনীতির দৈনন্দিনতায় ফিরে আসার একটা ইঙ্গিত? যে দল তাঁর প্রতি কোনো আগ্রহ দেখায় না , সেই দলের সমাবেশে তিনি যান। অতি সাধারণ শ্রোতার মতো দর্শক আসনে বসে থাকেন।তাঁকে দেখে হয়তো তাঁর পুরনো দলের কোনো কোনো সতীর্থর মনে ক্ষেদোক্তি বেড়িয়ে আসে;” আহা , এই ‘ বিনয়’ টাই যদি অনিলদা ক্ষমতার মধ্য গগণে থেকে দেখাতেন।” হয়তো এই বিনয়টা অনিল বসু, অনিল বসুরা ক্ষমতার মধ্য গগণে থেকে দেখাতেন তাহলে হয়তো এমনটা দশা আজ সি পি আই( এম) তথা গোটা বামফ্রন্টের হতো না!

Leave a Reply

Top